Monday, November 6, 2017

আলোছায়া - অর্পণ মাজি



মুছে গেছে পাশাপশি হেঁটে চলা পায়ের দাগ ,
মুছে গেছে শক্ত করে ধরে রাখা হাতমুঠো ঘাম,
লুকোনো ডায়রির ভাঁজ করা পাতায় মুছে গেছে স্মৃতি,
আবছায়া তোর নাম।

তবু আজও আধঘুম চোখে
ভোরের আকাশ দেখি তোর সাথে,
উদাসী বিকেলে তোর হাত ধরে হাঁটি ,
বৃষ্টি ভিজি,যেমন ভিজতাম তখন,
তুই আছিস কি নেই ?
এ ঘোর জানিনা,জানিনা কাটবে কখন....

চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো ছায়ার।কলিং বেলটা বেজে উঠলো এমন সময়।কবিতাপাঠে বাধা পড়ল।বিকেল সাড়ে চারটে।ছায়া আর সূর্য্যের দশ বছরের মেয়ে রিমি স্কুল থেকে ফেরে এসময়।
-জানো মা আজ স্কুলে কী হয়েছে?
-আগে ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নে তারপর শুনবো তোর গল্প।
মেয়ের জন্য খাবারটা সাজিয়ে এনে ডাইনিং টেবিলে রাখল ছায়া।
-কইরে আয়।আজও টিফিন শেষ করিসনি!
-নতুন মিস্ আমাকে একটা জিনিস দিয়েছেন মা।দেখবে ?
-খেতে খেতে কথা বলেনা রি,আগে খেয়ে নে।আজ তো তোর নাচের ক্লাস আছে আবার।
            ***
-কী আজ এতো দেরি হলো তোমার?
-সারপ্রাইজ আছে।
-ও হ্যাঁ,রি তুইও যেন কী দেখাবি বলছিলি?
-আগে বাবার সারপ্রাইজ টা শুনি।
-বাবাকে হাতমুখ ধুয়ে নিতে  দে।তুই কী দেখাবি বলছিলি দেখা।
-দাঁড়াও ব্যাগটা আনি তাহলে।
ছায়া বিকেলের অসমাপ্ত কবিতাটা নিয়ে বসলো-

আজও সন্ধ্যে নামে এ শহরে,
দাঁড়িয়ে থাকি আমি রোজ,
তোর আসার সময় যায় বয়ে,
বারে বারে দেখি ঘড়ি, এখানেই একদিন এরকম সন্ধ্যেয় হয়েছিল
আমাদের প্রেমের হাতেখড়ি..."

-এই দেখো এই চাবির লকেটটা মিস্ আমাকে দিয়েছেন ভালো আবৃত্তি করার জন্য।মিস্ সই করেও দিয়েছেন দেখো।রিমি লকেট টায় সুন্দর ভাবে লেখা একটা নাম মাকে দেখালো।
-বাবা দেখো কী সুন্দর না লকেটটা !
সূর্য্য লকেটটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে জিগ্গেস করলো
-কোথায় পেলি এটা?
-নতুন মিস্ দিয়েছেন।আবৃত্তি শুনে খুশি হয়ে মিস্ আমায় এটা উপহার দিয়েছেন।ভালো না?
-যাও রি সোনা পড়ার ঘরে যাও।হোমওয়ার্ক গুলো করে নাও।বাবাকে জ্বালাতন করেনা।
             ***
ছায়া জোরে জোরে পড়তে শুরু করলো সেই অসমাপ্ত কবিতাটা -
"ধীরে ধীরে শুনশান হয় ব্যস্ত সড়ক,
ঘুমিয়ে জাগে স্ট্রীটলাইট ,
দু একটা কুকুর চেঁচায় নিয়ম করে,
হয়ত ফিরে যেতে বলে,
মিছে অপেক্ষা,আসবেনা সে আর,
একলা ছাদে জ্বলে স্মৃতির সিগারেট,
রোজ মরে ফের বাঁচে একটা জীর্ন লাশ,
যে হাতে ছিলো একদিন তোর হাত ধরা,
সে হাতে আজ ক্লান্ত কলম,
সব লিখে রাখার পুরনো বদভ্যাস।"

-আবার আমার ডায়রিটা হাত দিয়েছো!কতবার বলেছি...
-তোমার আলোই তাহলে রিমির স্কুলের নতুন মিস্ হয়ে এসেছে?
-এতোটা সিওর হচ্ছো কি করে ?
-লকেটে লেখা নামটা আর তোমার গিটারের মার্কার দিয়ে লেখা নামের স্টাইলটা একই সূর্য্য।আমি জানি তুমিও বুঝতে পারছো কিন্তু না বোঝার ভান করছো।
-হলোই বা আলো।কিন্তু ও আর আমার জীবনে নেই।শুধু কবিতায় আছে।কতোবার বলেছি আমার জীবনে এখন শুধু তুমি আর রি।
-দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায়না সূর্য্য।তুমি বলেছিলে তুমি ওকে পুরোপুরি ভুলে যাবে।
সূর্য্য কী উত্তর দেবে ভেবে পেলো না।হয়তো রবি ঠাকুরের "শেষের কবিতা" উপন্যাসের অমিতের মতো সূর্য্যও বলতে চায়-
তোমার  সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই,কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর আলোর সঙ্গে আমার ভালোবাসা সে হল  দিঘি। সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।
কিন্তু একটা কথাও বলতে পারলো না সূর্য্য।ছায়া মুখভার করে বসে রইলো বিছানার এক কোণে। পকেটের ভেতর থেকে হলিডে ট্যুরের সারপ্রাইজ টিকিটগুলো ছায়ার পাশে রেখে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে সূর্য্য ডায়ারি টা নিয়ে তার লেখার রুমে চলে গেলো।
"সূর্য থাকলে আলো থাকবেই ,
আলো থাকলে ছায়া,
আলোছায়াময় এ জীবন,
মেঘেদের আসা যাওয়া।
আজকের আজ আগামীতে গত,
যা কিছু গত বুকে সঞ্চিত,
পাল্টায় জন,পাল্টায় মন,
পাল্টায় কাছের মানুষজন,
অনুভূতিরা বুঝি একই থাকে?
রিয়েলাইজেশন!রিয়েলাইজেশন !"
               -সমাপ্ত-

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়

আমি সঙ্গীতা পাল এডিটর অফ মেঘ বৃষ্টি রোদ্দুর।আমাদের প্রথম যাত্রা শুরু হয় 2012 তে।প্রিনটেড পত্রিকা হিসেবে।এখন সময়ের দাবি রেখে শুরু হয়েছে...