Saturday, December 9, 2017

অতন্দ্রিতা - কবি স্বর্ভানু সান্যাল



টাইগ্রিস নদীর তীরে মরে যাওয়া তারার মতো
ম্লান তোমাকে দেখেছি; তখন রাত্রি গত।
তারারা সব খসে পড়েছে বাসি ফুলের ভিড়ে
সারা রাত প্রহর জেগে।  তুমি একলা বসে নদীর তীরে
দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিলে; তোমার চোখের
নীল তারাটা খুঁজছিল নদীর জলের
ঝিলমিলিতে তোমার মনের মানুষের ছায়াখানি;
তোমার ঠোঁটে ছিলো
অতন্দ্র প্রতীক্ষা..তোমার অধর থরথর আবেশে কাঁপছিলো
যেমন বাঁশবনেতে বাশের পাতায়
মৃদু কাঁপন আনে ফাল্গুনি হাওয়ায়
ভ্রমর যেমন কাঁপে প্রিয়র পরশ সুখে
তেমনি উদ্বেলিত পূর্বরাগ তোমার মুখে
ভোরের আলো হয়ে ছড়িয়েছিল, বৃদ্ধ ধ্রুবতারা
লোভীর মতো তাকিয়েছিল তোমার দিকে; বাক্যহারা,
তন্ময় হয়ে দেখছিল তোমার নিটোল স্তনপুটের
শোভা, অমানিশার মৃত রাত্রি জাগরণের
ক্লান্তি অপনোদন হচ্ছিল তোমার মুখের পানে
চেয়ে, অলস মেদুর বাতাস বয়ে আনে
তোমার শ্যাওলা গন্ধ, তুমি ইলশেগুড়ি বৃষ্টির মত
অনুজ্জল; সভ্যতার কোন এক আদি  লগ্ন থেকে কত শত
বছর ধরে তুমি ঐ দূরে
নাম-না-জানা এক পিরামিডের বিবরে
বন্দিনী ছিলে, নন্দিনী তোমার  সব কামনা
সব না-পাওয়া, সব ইচ্ছে, সব নির্জনতা
সব ব্যাথা, সব নীরবতা হাজার বছর ধরে
তোমার জীবিত কবরে,
এক অসফল মৃত মিশর রাজার সাথে
অন্ধকার রন্ধ্র গলি খুঁজে মরেছে,
মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে মাথা কুটেছে
অর্বুদ কোটি অন্ধ দিবারাতে,
অক্ষম নিরালাতে।


ওগো রাজদাসী,
আর জন্মে বলেছিলেম “তোমায় ভালবাসি”
তোমার মৃণাল-আঁখি মেলে দেখো আমায়;
রাজার শরীর-বিছে শান্ত হলে আমার প্রতিক্ষায়
প্রহর জেগে থাকতে তুমি অন্তঃপুরে
গভীর মরণ নিতাম আমি তোমার শরীর জুড়ে
দুই প্রাণেতে বাজত সঙ্গীত
রুদ্ধ-কারা পাখির মত দিকবিহিত-
শুণ্য দুটি প্রাণ  উঠত মেতে মত্ত অভিলাষে।
ছাতিম ফুলের গন্ধে যেমন সাপ আসে
তেমন করেই গভীর রাতে, গোপন পথে, চন্দ্রালোকে
তোমার কক্ষে আমার অভিসার। কুরুবকের
মালা খোঁপায়, শঙ্খিনী সাপ-শরীর তোমার কুসুমশয্যায়
ছিন্নলতার মতন পড়ে থাকত। আমার ছোঁয়ায়
জাগত তোমার শরীর অম্লমধুর শিহরণে।
মত্ত হরিণীর মত তোমার বেতস-লতা-বাহু দিয়ে প্রাণপণে
আমায় জড়িয়ে ধরে আমার কর্ণকুহরে
গলা-লোহার মত তোমার তপ্ত অধরের
ছোঁয়া বলত যেন ফিসফিসিয়ে “তোমায় ভালবাসি।” তুমি
উন্মাদিনি নির্ঝরিণীর মত আমার সর্ব অঙ্গ চুমি
আছড়ে দুমড়ে পড়তে আমার সারা শরীর জুড়ে
সেই গোপন অন্তঃপুরে।

আতর গন্ধ ভরা তোমার অপ্রশস্ত গভীর সানুদেশের
নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম কোন এক দুর দারুচিনি দেশের
যেখানে তোমায় নিয়ে পালিয়ে যাব এক শীতের রাত্তিরে
ছোট্ট আমাদের ঘরটা হবে ক্ষীণতোয়াটির তীরে
নদীর জলে ধুইয়ে দেব তোমার সকল ক্লেদ, সকল যন্ত্রণা, ওগো রাজদাসী,
তখন তুমি মুক্ত বিহঙ্গী, তখন তুমি আমার মহীয়সি
যখন প্রাক-সন্ধ্যা কালে তোমায় নিয়ে করব নৌকাবিহার
তোমার কাঁঠালচাপা গন্ধটুকু নেবার
হেতু আকুল বাতাস ঘন হয়ে থাকবে তোমার
আশেপাশে, ধুলোমাখা ঘোড়ার খুরের মত মলিন
চতুর্থী-চাঁদ আশ মিটিয়ে দেখবে তোমায়,
আলো দেওয়ার ছলে। বিলীন
হবে সব তারা মাসকলাই-কালো মেঘের পিছে
তোমার কাঁকন-পায়ের ছোঁয়ায়
ছলাৎ ছলাৎ সুর বাজবে নদীর জলে, নীচে
দীগন্ত-ব্যাপী সেই আলো-আঁধারি,  শ্রান্ত শ্যামলিমায়
শ্যামাঙ্গী, তোমার শরীরের নগ্নতায়
পথভ্রস্ট মরুযাত্রীর মত হারিয়ে যাব তোমার শরীর গহনে
অংকুরিত ইচ্ছা ছিল মনে

সেদিন রক্তমেঘ ছিল ইশান কোণে
আর গভীর রোদন আমার প্রাণে
যেদিন নিয়ে গেল তোমায় সুসজ্জিত চতুর্দোলায়
রাজ-সমাধির অন্ধ কারায়
মৃত রাজার সেবার তরে
সেখানে তুমি হাজার বছর  ধরে
অপেক্ষা করেছ কি আমায় ছোঁয়ার?
আমার গন্ধ নেবার?

তাই কি সেদিন নদীর জলে পা ডুবিয়ে দুর পাহাড়ে
আমায় খোঁজ? তোমার অতৃপ্ততায় ম্লান শরীরে
ডুব দিয়ে স্নান করব বলে কাছে গেলে
তুমি এক বিন্দু অশ্রু হয়ে মিলিয়ে গেলে
টাইগ্রিস নদীর জলে।

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়

আমি সঙ্গীতা পাল এডিটর অফ মেঘ বৃষ্টি রোদ্দুর।আমাদের প্রথম যাত্রা শুরু হয় 2012 তে।প্রিনটেড পত্রিকা হিসেবে।এখন সময়ের দাবি রেখে শুরু হয়েছে...